1. forhad.one@gmail.com : Forhad Shikder : Forhad Shikder
  2. s.m.amanurrahman@gmail.com : pD97wRq9D9 :
করোনাভাইরাস পরবর্তী বিশ্ব - Top News
রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১১:২৬ অপরাহ্ন

করোনাভাইরাস পরবর্তী বিশ্ব

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২০
  • ১৪১ সময়
করোনাভাইরাস পরবর্তী বিশ্ব

২০১৮ সালের ২৯ জুন, ইতালির মিলান শহরের রাস্তায় টিভবয় নামে এক চিত্রশিল্পীর আঁকা একটি ছবি যেখানে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং একটি আইফোন ধরে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুয়াওয়ে মোবাইল ফোন ধরে একে অপরকে চুম্বন করছেন। এএফপি

আমরা কি বিভেদের রাস্তায় হাঁটবো নাকি আমরা বৈশ্বিক সংহতির পথ বেছে নেব, আমরা যদি বিভেদকে বেছে নিই তবে এটি কেবল সঙ্কটকালকে আরও দীর্ঘায়িত করবে না বরং ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হবে, এই ঝড় অতিক্রান্ত হবে, কিন্তু যেই সিদ্ধান্তগুলো আমরা এখন গ্রহণ করবো সেগুলো আমাদের জীবনধারাকে সামনের বছরগুলোতে তাৎপর্যপূর্ণভাবে বদলে দিতে পারে।

মানব প্রজাতি বর্তমানে এক বৈশ্বিক সঙ্কট মোকাবিলা করছে। যা সম্ভবত আমাদের প্রজন্মের দেখা সবচেয়ে বড় সঙ্কট। সামনের কয়েক সপ্তাহে মানুষজন এবং সরকারসমূহ যে সিদ্ধান্তগুলো নিতে যাচ্ছে তা সম্ভবত সামনের বছরগুলোতে বিশ্বের রূপরেখা নির্ধারণ করে দিতে পারে। এগুলো যে শুধু আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আকার দেবে তা নয়, বরং আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতিকেও বদলে দিতে পারে। আমাদের খুব দ্রুত ও স্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।

আমাদেরকে অবশ্যই আবার এই পদক্ষেপসমূহের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে। বিকল্প পদক্ষেপগুলোর মধ্যে থেকে একটি বাছাই করার সময় আমাদের নিজেদের শুধুমাত্র এটি জিজ্ঞেস করলেই চলবে না যে, আমরা এই তাৎক্ষণিক সঙ্কট থেকে কিভাবে পার পাবো, বরং এটাও মাথায় রাখতে হবে যে ভবিষ্যতে এই ঝড় পরবর্তী সময়ে আমরা কোন ধরনের বিশ্বে বসবাস করতে চাই। হ্যাঁ, এই বিপদ একদিন শেষ হয়ে যাবে, বেশীরভাগ মানুষ-ই টিকে থাকবে-কিন্তু আমরা এক ভিন্ন পৃথিবীতে বসবাস করবো।

অনেকগুলো স্বল্প-মেয়াদী জরুরি পদক্ষেপ বা ব্যবস্থাপনা আমাদের জীবনের নিত্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠবে। আর এটাই জরুরি ব্যবস্থার প্রকৃতি। এগুলো ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলোকে দ্রুতই এগিয়ে নিয়ে আসে। স্বাভাবিক সময়ে যে সিদ্ধান্তগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকে সেগুলো জরুরি সময়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বস্তবায়িত হয়ে যায়। অপরিণত এবং এমনকি বিপদজনক প্রযুক্তির ব্যবহারও শুরু হতে পারে, কারণ কিছু না করার বিপদ এর চেয়েও বড় হয়ে সামনে আসে।

সমগ্র দেশগুলো বড়সড় ধরনের সামাজিক পরীক্ষণের গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কি ঘটবে যখন সবাই বাড়িতে বসে কাজ করা শুরু করবে কিংবা নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে যোগাযোগ করবে? কি ঘটবে যখন সকল বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন ব্যাবস্থায় চলতে শুরু করবে? স্বাভাবিক সময়ে সরকারগুলো, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং শিক্ষা বোর্ডগুলো কখনোই এমন ধরনের পরীক্ষা চালানোর জন্য রাজি হতো না। কিন্তু এটি কোনো স্বাভাবিক সময় নয়।

এই সঙ্কটকালে আমরা নির্দিষ্ট করে বললে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পছন্দের মুখোমুখি হয়েছি। প্রথমটি হচ্ছে সর্বগ্রাসী নজরদারি (টোটালিটেরিয়ান সার্ভিলিয়েন্স) এবং নাগরিক ক্ষমতায়ণের মধ্যেকার পছন্দ, এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা এবং বৈশ্বিক সংহতির মধ্যেকার পছন্দ।

চামড়ার নিচে নজরদারি : মহামারি ঠেকানোর জন্য সমগ্র জনগোষ্ঠীসমূহের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। এইটা সূচারু রূপে বস্তবায়ন করার জন্য প্রধানত দুইটি পথ খোলা আছে। সরকারের জন্য একটি হলো মানুষজনকে পর্যবেক্ষণ করা, এবং যারা নিয়ম মানবে না তাদের ধরে শাস্তি দেওয়া। আজ মানব ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো প্রযুক্তি সবাইকে সব সময় পর্যবেক্ষণ করার সক্ষমতাকে সম্ভবপর করেছে।

পঞ্চাশ বছর আগে, কেজিবি দুইশ চল্লিশ মিলিয়ন সোভিয়েত নাগরিককে দিনে চব্বিশ ঘন্টা অনুসরণ করতে পারতো না, কিংবা কেজিবি যে সকল তথ্যাদি সংগ্রহ করতে পারতো সেগুলোকে সুষ্ঠুভাবে প্রক্রিয়াধীন করার আশাও করতে পারতো না। কেজিবি নির্ভর করতো মানব এজেন্ট ও বিশ্লেষতদের উপর, এবং মানব এজেন্ট দিয়ে প্রত্যেক নাগরিককে অনুসরণ করা সম্ভবপরও ছিলো না। কিন্তু বর্তমানে সরকারগুলো রক্ত-মাংসের চরের পরিবর্তে সর্বব্যাপী সেন্সর এবং শক্তিশালী অ্যালগরিদমসমূহের উপর নির্ভর করতে পারে।

করোনাভাইরাস সৃষ্ট মহামারির সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে অনেকগুলো সরকার ইতোমধ্যেই নতুন ধরনের নজরদারির কৌশল প্রয়োগ করা শুরু করেছে। সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো হলো চীন। চীন মানুষজনের স্মার্টফোনগুলোকে ঘনিষ্ঠভাবে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের মধ্যে দিয়ে মুখাবয়ব চিহ্নিত করতে সক্ষম লাখ লাখ ক্যামেরাসমূহের ফায়দা নিয়েছে এবং মানুষজনকে বাধ্য করেছে তাদের শরীরের তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করে রিপোর্ট করতে। চায়নিজ কর্তৃপক্ষ এর মধ্য দিয়ে সন্দেহভাজন করোনাবাহকদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি তাদের চলাচলকে অনুসরণ করতে পেরেছে এবং তাদের সংস্পর্শে আসা যে কাউকেও বের করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে।

এমন কতগুলো মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তারা উদ্ভাবন করেছে যেগুলো নাগরিকদের সংক্রামিত রোগীদের সান্নিধ্য সম্পর্কে সতর্ক করেছে। এই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার কেবলমাত্র পূর্ব এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই, সম্প্রকি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থাকে করোনাভাইরাসে সংক্রামিত রোগী সনাক্ত করার জন্য উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছেন, যেগুলো কিনা ইতোপূর্বে সাধারণত সন্ত্রাস দমনে ব্যবহৃত হয়ে আসছিলো। যখন কিনা এই সংক্রান্ত সংসদীয় উপ-কমিটি এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করলো, নেতানিয়াহু তখন তার নিজস্ব ক্ষমতাবলে এটিকে “জরুরি বিধি” হিসেবে ঘোষণা করে।

এখন আপনি বলতেই পারে যে, এগুলো নতুন কিছুই নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারসমূহ এবং কর্পোরেশনগুলো মানুষকে অনুসরণ, পর্যবেক্ষণ এবং সুনিপুণভাবে পরিচালনা করার জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। তবুও এত কিছুর পরেও আমরা যদি সতর্ক না হই তবে মহামারির এই সময় নজরদারির ইতিহাসে এক চরম মুহূর্ত হয়ে থাকবে।

এটা শুধুমাত্র এইজন্য হবে না যে, এতদিন ধরে গণ-নজরদারির প্রযুক্তি ব্যাবহারে যেসব দেশ অনাকাঙ্খা দেখিয়েছে সেগুলো এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বর্তমান পরিস্থিতিতে শুরু করতে পারে, বরং পাশাপাশি এই মহামারির সময় “চামড়ার উপর” থেকে “চামড়ার নিচে” নজরদারি শুরুর নাটকীয় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ হয়ে থাকতে পারে। এতদিন পর্যন্ত যখনি কারও আঙ্গুল তার স্মার্টফোন স্পর্শ করেছে এবং কোন লিঙ্কে চাপ দিয়েছে, সরকার ওয়াকিবহাল হতে চাইতো যে তার আঙ্গুল ঠিক কোন বিষয়টি জানার জন্য আগ্রহী, কিন্তু করোনাভাইরাসের এই সময়ে আগ্রহের জায়গার বদল ঘটেছে, সরকার এখন জানতে চায়, যে আঙ্গুলটি স্মার্টফোন স্পর্শ করেছে সেই আঙ্গুলের তাপমাত্রা কতো এবং ওই আঙ্গুলের নিচের রক্তচাপ কত।

জরুরি পুডিং : নজরদারি নিয়ে আলোচনায় যে সমস্যাটি প্রথমেই সামনে আসে তা হলো, আমরা আসলে কেউই সঠিকভাবে জানি না যে আমাদের কিভাবে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে এবং সামনের বছরগুলো আরো কি কি এখানে যুক্ত হতে পারে, বিশেষ করে যখন নজরদারি করার প্রযুক্তির বিকাশ ভয়াবহ গতিতে ঘটছে। দশ বছর আগেও যা মনে হতো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী তা এখন পুরনো খবর। এখন চিন্তার খাতিরে মনে করা যাক, কোন এক অনুমিত সরকার চাচ্ছে যে প্রত্যোক নাগরিক একটি বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরবে যা চব্বিশ ঘন্টা তাদের শরীরের তাপমাত্রা এবং হৃদক্রিয়ার হার পর্যবেক্ষণ করবে, এবং এ থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি সরকারের অ্যালগরিদম এর সাহায্য পুঞ্জীভুত করা হবে এবং বিশ্লেষণ করা হবে।

অ্যালগরিদম আপনি নিজে জানার আগে জেনে যাবে আপনি অসুস্থ কিনা, তারা আরো জেনে যাবে যে আপনি কোথায় ছিলেন বা কার সাথে দেখা করেছেন। এতে করে সংক্রমনের শেকলগুলোকে চরমভাবে সংক্ষিপ্ত করা যেতে পারে, এমনকি একবারে পুরোপুরি কেটেও ফেলা যেতে পারে। এরকম একটি ব্যবস্থা কয়েকদিনের মধ্যেই যুক্তিতর্ক সাপেক্ষে মহামারি থামিয়ে দিতে পারে। শুনতে খুব দুর্দান্ত লাগছে, তাই না?

এরকম একটি ব্যবস্থার নেতিবাচক দিক অবশ্যই এটি হবে যে, এই ব্যবস্থা এক আতঙ্কজনক নতুন নজরদারিকে বৈধতা প্রদান করবে। উদাহরণস্বরুপ, যদি আপনি জানতে পেরে যান যে, আমি সিএনএন নয় বরং ফক্স নিউজের কোন সংবাদ লিঙ্কে চাপ দিয়েছি, তা আপনাকে আমার রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে এমনকি হয়তো আমার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছু ধারণা দিতে পারে। কিন্তু আপনি যদি এটি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন যে যখন আমি ওই লিঙ্কের ভিডিওটি দেখছি তখন আমার শরীরের তাপমাত্রায়, রক্তচাপে এবং হৃদক্রিয়ার হারে কি ঘটছে তাহলে আপনি জেনে যাবেন, কিসব বিষয় আমাকে হাসাতে পারে, কি আমাকে কাঁদাতে পারে, এবং কি ধরনের বিষয়াদি আমাকে সত্যি সত্যিই রাগিয়ে দেয়। এটা মনে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, জ্বর এবং কাশির মতনই রাগ, আনন্দ, বিরক্তি এবং ভালোবাসা একেকটি জৈবিক প্রপঞ্চ।

যদি কর্পোরেশন এবং সরকারগুলো আমাদের এই ধরনের তথ্য উপাত্ত গণহারে সংগ্রহ করা শুরু করে তবে তারা আমাদের নিজেদের চাইতেও আমাদেরকে অনেকগুণ বেশি ভালো জানতে পেরে যাবে, এবং তখন তারা শুধুমাত্র আমাদের অনুভূতিগুলো যে অনুমান করতে পারবে শুধু তা নয় বরং আমাদের অনুভূতিগুলোতে সুনিপুণভাবে পরিচালিতও করতে পারবে, ফলে তারা আমাদের কাছে যা খুশি তাই বিক্রি করতে পারবে-হোক সেটা কোনো পণ্য বা কোনো রাজনীতিবিদ। বায়োমেট্রিক এই পর্যবেক্ষণ প্রণালীর তুলনায় ক্যামব্রিজ এর বিশ্লেষকদের তথ্য হ্যাকিংয়ের কৌশলকে মনে হবে প্রস্তর যুগের কিছু একটা। নিজেকে কল্পনা করুন উত্তর কোরিয়াতে, যেখানে ২০৩০ সাল নাগাদ সবাই চব্বিশ ঘন্টা এমন বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরছে এবং আপনি মহান নেতার বক্তব্য শুনছেন, সে মুহূর্তে ব্রেসলেট আপনার রেগে যাওয়ার লক্ষণ সনাক্ত করতে পারলে আপনি শেষ।

আপনি অবশ্যই বায়োমেট্রিক নজরদারিকে জরুরি অবস্থার সাপেক্ষে অস্থায়ী একটা ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন, যা জরুরি অবস্থা অতিক্রান্ত হবার সাথে সাথে রহিত করা হবে। কিন্তু এরকম অস্থায়ী পদক্ষেপগুলোর নোংরা একটা স্বভাবই হলো এগুলো জরুরি অবস্থা শেষের পরেও থেকে যায়, বিশেষ করে যখন সব সময়ই নতুন জরুরি অবস্থা তৈরির সম্ভাবনা থেকে যায়।

উদাহরণস্বরুপ, আমার স্বদেশ ইসরায়েল ১৯৪৮ সালে এর স্বাধীণতা যুদ্ধের সময় সংবাদ সেন্সরশীপ এবং পুডিং তৈরির জন্য বিশেষ বিধি রেখে জমি বজেয়াপ্তকরণ (আমি মোটেও মজা করছি না) থেকে শুরু করে বেশ কয়েকটি অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলো, স্বাধীনতা যুদ্ধ জয় হলো দীর্ঘকাল হয়েছে, কিন্তু ইসরায়েল কখনোই জরুরি অবস্থা শেষ এমন ঘোষণা দেয়নি, এবং ১৯৪৮ সালের অনেকগুলো “অস্থায়ী” ব্যবস্থা বাতিল করতে ব্যর্থ হয়েছে (জরুরি পুডিং ডিক্রিটি দয়া করে ২০১১ সালে বাতিল করা হয়েছে)।

ঠিক তেমনি যখন করোনাভাইরাস হতে সংক্রমণ যখন শূণ্যতে নেমে আসবে তখনো তথ্যলোভী সরকারগুলো দ্বিতীয়বার করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ভয়ের কথা বলে বায়োমেট্রিক নজরদারিত্ব জারি রাখতে পারে, অথবা বলতে পারে মধ্য আফ্রিকায় ইবোলার নতুন প্রাদুর্ভাবের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, অথবা বলতে পারে…….নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটা বড়সড় লড়াই চলছে, করোনাভাইরাস সৃষ্ট সঙ্কট হতে পারে এই লড়াইয়ের একটা চূড়ান্ত বিন্দু, কেননা যখন মানুষকে গোপনীয়তা এবং স্বাস্থ্য এই দুইয়ের মধ্যে একটি বাছাই করতে বলা হবে, তারা স্বাভাবিকভাবেই স্বাস্থ্য-কে বেছে নিবে।

সাবান পুলিশ : মানুষকে স্বাস্থ্য এবং গোপনীয়তা এই দুইয়ের মাঝে একটি বাছাই করতে বলার মধ্যেই সমস্যার শেকড় নিহিত। কেননা এটা একটা মিথ্যা বাছাই, আমরা স্বাস্থ্য এবং গোপনীয়তা উভয়ই ভোগ করতে পারি এবং আমাদের তা পারা উচিতও। আমরা আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা করতে পারি এবং করোনাভাইরাস সৃষ্ট মহামারি থামিয়ে দিতে পারি, তবে তা নিরঙ্কুশ নজরদারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে নয় বরং আমরা এটা করতে পারি নাগরিকদের ক্ষমতায়ণের মাধ্যমে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে করোনাভাইরাস মহামারি নিয়ন্ত্রণ এর সবচেয়ে সফল প্রচেষ্টাগুলোর কয়েকটি সংগঠিত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরে। যদিও এই দেশগুলো নাগরিকদের ট্র্যাকিং অ্যাপ্লিকেশন গুলোর কিছুটা ব্যবহার করেছিলো কিন্তু তারা মূলত ব্যাপক আকারে পরীক্ষা, সৎ প্রতিবেদন দাখিল এবং সু-জ্ঞাত জনগণের ঐচ্ছিক সহযোগিতার উপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছে।

কেন্দ্রীভূত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং কঠোর শাস্তি প্রদানই মানুষকে কার্যকরী নিয়ম মেনে চলানোর একমাত্র পথ নয়। যখন মানুষকে বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো জানানো হয় এবং যখন মানুষ তাদের সরকারি কর্তৃপক্ষকে এ সমস্ত তথ্যগুলো জানানোর জন্য বিশ্বাস করে তখন নাগরিকরা তাদের কাঁধের উপর দিয়ে কোনো বড় ভাইয়ের নজরদারি বাদেই সঠিক কাজগুলো করতে পারে। একটি স্ব-প্রণোদিত এবং ভালোরুপে ওয়াকিবহাল জনগোষ্ঠী স্বাভাবিক ভাবেই একটি তদারকি করা অজ্ঞ জনগোষ্ঠীর চেয়ে অনেক শক্তিশালী এবং কার্যকর হবে। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, সাবান দিয়ে নিজের হাত ধোয়ার বিষয়টি।

এটি মানব স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে সর্বকালের সেরা অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত। এই নিতান্ত সাধারণ কাজটি প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ জীবন রক্ষা করে। এখন আমরা এটিকে একেবারে স্বাভাবিক হিসেবে দেখলেও, কেবলমাত্র ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানীরা সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার গুরুত্ব আবিষ্কার করেছিলো। এর আগে এমনকি ডাক্তার ও নার্সরাও এক সার্জিক্যাল অপারেশন থেকে অন্যটিতে সাবান দিয়ে হাত না ধুয়েই চলে যেতো। আজ শতকোটি মানুষ প্রতিদিন সাবান দিয়ে হাত ধোয় এ জন্য নয় যে তারা সাবান পুলিশ এর ভয়ে আছে বরং এ জন্য যে তারা বিষয়টির গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত।

আমি আমার হাত সাবান দিয়ে ধুই কারণ আমি ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়া সম্পর্কে জানি, এবং আমি বুঝতে পেরেছি যে এই ক্ষুদ্র প্রাণীসত্তাগুলো বিভিন্ন রোগের কারণ এবং আমি জানি যে সাবান এগুলোকে অপসারণ করতে পারে। কিন্তু এ রকম সম্মতি এবং সহযোগিতার পর্যায় অর্জন করতে হলে আপনার দরকার আস্থা। মানুষের বিজ্ঞানকে, তাদের সরকারি কর্তৃপক্ষকে এবং গণমাধ্যমকে বিশ্বাস করতে হবে। বিগত কয়েক বছরে দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিজ্ঞানের উপর, সরকারি কর্তৃপক্ষের উপর এবং গণমাধ্যমের উপর মানুষের বিশ্বাসকে কমিয়ে দিয়েছে। এখন এই একই দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা সঠিক কাজ করার জন্য জনসাধারণের উপর ভরসা করা যায় না এই যুক্তি দিয়ে কর্তৃত্ববাদের উঁচু রাস্তা ধরে এগোনোর জন্য প্রলোভিত হতে পারে।

সাধারণত, যেই বিশ্বাস বছরের পর বছর ধরে হারিয়েছে তা রাতারাতি পুনরায় তৈরি করা যায় না। কিন্তু এখন কোনো স্বাভাবিক সময় নয়। সঙ্কটের মুহূর্তে মানসিকতাও খুব দ্রুত বদলে যেতে পারে। আপনার সহোদরদের সাথে বছরের পর বছর আপনার তিক্ত সম্পর্ক থাকতে পারে কিন্তু যখন খুব জরুরি কিছু ঘটে যায় আপনি হঠাৎ তাদের প্রতিও বিশ্বাসের এক গোপন জলাধার আবিষ্কার করেন এবং একে অপরকে সাহায্য করার জন্য ছুটে যান।

নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে তাই বিজ্ঞান, সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এখনো খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি। আমাদের অবশ্যই নতুন প্রযুক্তিগুলোকেও কাজে লাগাতে হবে, তবে এই প্রযুক্তিগুলোকে ব্যবহার করতে হবে নাগরিকদের ক্ষমতায়ণের জন্য। আমার শরীরের তাপমাত্রা এবং রক্তচাপ পর্যবেক্ষণে আমার কোনো আপত্তি নেই, তবে সেই তথ্যাদি ব্যবহার করে একটি সর্বক্ষমতাধর সরকার গঠন উচিত নয়। বরং সেই তথ্যাদি যাতে করে আমাকে আরো সচেতনভাবে ব্যাক্তিগত পছন্দের ক্ষেত্রে সহায়তা করে এবং সরকারকে তার সিদ্ধান্তসমূহের জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য ব্যবহার করা হয়।

যদি আমি আমার স্বাস্থ্যগত অবস্থা চব্বিশ ঘন্টা পর্যবেক্ষণ করতে পারি, তবে আমি শুধু এটাই জানবো না যে আমি অপরের জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি বয়ে বেড়াচ্ছি কিনা, আমি এটাও জানতে পারবো যে কোন কোন অভ্যাসগুলো আমার স্বাস্থ্যর জন্য উপকারি। এবং আমি যদি করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানে প্রবেশাধিকার পাই এবং বিশ্লেষণের সুযোগ পাই তবে আমি বুঝতে পারবো সরকার কি সত্যি বলছে কিনা এবং মহামারি নিয়ন্ত্রণে সঠিক নীতি গ্রহণ করেছে কিনা।

যখন মানুষ নজরদারির কথা বলে তখন একটা বিষয় স্মরণ রাখা জরুরি যে, একই নজরদারির প্রযুক্তির মাধ্যমে সরকার যেমন ব্যক্তিবর্গকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে তেমনি ব্যক্তিরাও পারে সরকারকে পর্যবেক্ষণ করতে। সুতরাং, করোনাভাইরাস মহামারি নাগরিকত্বের এক বিরাট পরীক্ষা। সামনের দিনগুলিতে আমাদের প্রত্যেকের উচিৎ ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্বসমূহ এবং স্বার্থবাদী রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের উপর নির্ভর করা। আমরা যদি সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে ব্যর্থ হই তবে আমরা আমাদের সাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এটিকে একমাত্র উপায় ভেবে বসে আমাদের মহামূল্যবান স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলতে পারে।

আমাদের প্রয়োজন একটি বৈশ্বিক পরিকল্পনা : দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ বাছাইয়ের মুখোমুখি আমরা দাঁড়িয়ে তা হলো জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা এবং বৈশ্বিক সংহতির মধ্যেকার একটি পছন্দ করার বিষয়। খোদ মহামারি এবং এর ফলাফলস্বরুপ যে অর্থনৈতিক সঙ্কট, উভয়ই বৈশ্বিক সমস্যা। এগুলো শুধুমাত্র বৈশ্বিক সহযোগিতার মধ্য দিয়েই কার্যকরভাবে সমাধান করা সম্ভব। প্রথমত এবং প্রধানত এই ভাইরাসকে পরাজিত করতে হলে আমাদের বৈশ্বিকভাবে তথ্য আদান-প্রদান জরুরি। ভাইরাসের উপর মানুষের এটা সবচেয়ে বড় সুবিধা।

চীনের একটি করোনাভাইরাস এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি করোনাভাইরাস কিভাবে মানুষকে সংক্রমিত করা যায় সে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ আদান-প্রদান করতে পারবে না, কিন্তু চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে করোনাভাইরাস সম্পর্কে এবং একে কিভাবে মোকাবিলা করা যায় সে বিষয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে। এভাবে মিলানে একজন ইতালিয়ান ডাক্তার যা আবিষ্কার করবে তা দিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ তেহরানে বহু প্রাণ বাঁচানো সম্ভবপর হতে পারে। যখন কিনা যুক্তরাজ্য সরকার বেশ কয়েকটি নীতি নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকে তখন তারা কোরিয়ানদের সহায়তা নিতে পারে যারা কিনা এক মাস আগেই এমন দোটানার মুখোমুখি হয়েছিলো। তবে এমনটা ঘটবার জন্য আমাদের প্রয়োজন বৈশ্বিক সহযোগিতা ও আস্থা।

দেশগুলোর উচিত খোলাখুলিভাবে তথ্য ভাগাভাগি করা এবং নম্রভাবে পরামর্শ চাওয়া, এবং একইসাথে প্রাপ্ত তথ্যাদি এবং অন্তদৃষ্টিগুলোর উপর আস্থা রাখা। আমাদের আরো যেটা প্রয়োজন তাহলো পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিটস্ এবং শ্বাসযন্ত্রের মেশিনগুলোন মত অপরিহার্য চিকিৎসা সরঞ্জমাদি উৎপাদন ও বন্টনের একটি বৈশ্বিক প্রচেষ্টা। প্রতিটি দেশ আলাদা করে স্থানীয়ভাবে এটা করার চেষ্টা না করে এবং যা কিছু পাওয়া যায় তাই সংগ্রহ করার পরিবর্তে একটি সমন্বিত বৈশ্বিক প্রচেষ্টা জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জমাদির উৎপাদন এবং এগুলোর সুষ্ঠ বন্টনকে তীব্রভাবে ত্বরান্বিত করতে পারে।

যুদ্ধের সময় যেভাবে দেশগুলো তাদের মূল শিল্পগুলোকে জাতীয়করণ করে তেমনি করোনাভাইরাসের সাথে মানুষের এই যুদ্ধে আমাদের মূল উৎপাদন লাইনগুলোকে আরো “মানবিক” করে তোলার প্রয়োজন হতে পারে। কয়েকটি করোনাভাইরাস কেইস পাওয়া একটি ধনী রাষ্ট্র বহু করোনাভাইরাস কেইস পাওয়া একটি দরিদ্র রাষ্ট্রকে মূল্যবান সরঞ্জমাদি দিয়ে সাহায্য করা উচিত এই বিশ্বাস রেখে যে, যদি এবং পরবর্তী সময়ে তাদের সাহায্যর প্রয়োজন হয় তবে অন্যান্য দেশ তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবে।

আমরা চিকিৎসা কর্মীদের পুল করার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈশ্বিক প্রচেষ্টার কথা ভাবতে পারি। বর্তমানে কম ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোতে তাদের প্রয়োজনের সময় সহায়তা ও মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য চিকিৎসাকর্মীদের পাঠাতে পারে, এতে করে পরবর্তীতে যদি মহামারির কেন্দ্র পরিবর্তন হয় তবে বিপরীত দিক থেকে সাহায্য আসা শুরু করবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক সহযোগিতার নিদর্শন অতীব প্রয়োজন। অর্থনীতি এবং সরবরাহ চেইনের বৈশ্বিক প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে যদি প্রত্যেকিটি সরকার অন্যদের সম্পূর্ন উপেক্ষা করে নিজেদের কাজ করে যায় তবে তার ফলাফল হবে বিশৃঙ্খলা ও এক গভীর সঙ্কট। আমাদের কার্যপদ্ধতির একটি বৈশ্বিক পরিকল্পনা প্রয়োজন এবং তা খুব দ্রুতই প্রয়োজন।

আরেকটি প্রয়োজনীয় বিষয় হলো একটি ভ্রমণ সংক্রান্ত মতানৈক্য পৌঁছানো। কয়েকমাস ধরে একটানা সকল আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ভয়াবহ সমস্যার সৃষ্টি করবে এবং করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে বাধাগ্রস্ত করবে। বিজ্ঞানী, ডাক্তার, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং ব্যাবসায়ীদের মতন জরুরি ভ্রমনকারীরা যাতে দেশগুলোর সীমানা পার হতে পারে সেজন্য দেশগুলোকে সহযোগিতামূলক মনোভাব পোষণ করতে হবে। ভ্রমনকারীদের নিজে দেশের সীমানায় পরীক্ষা করার একটা বৈশ্বিক মতানৈক্যর মাধ্যমে এটা ঘটতে পারে। যদি কেউ নিশ্চিত হয় যে শুধুমাত্র সতর্কভাবে পরীক্ষা করার মধ্যে দিয়ে ভ্রমনকারীদের উড়োজাহাজে চড়ার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে তবে তারা ভ্রমনকারীদের তাদের দেশে গ্রহণ করতে আপত্তি করবে না।

দুর্ভাগ্যক্রমে বর্তমানে দেশগুলি উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর কোনোটিই তেমনভাবে কেউ করছে না। যেন মনে হচ্ছে সবাই একটা সংঘবদ্ধ পক্ষাগাতগ্রস্ততায় ভুগছে। মনে হচ্ছে এই পরিস্থিতিতে কোন প্রাপ্তবয়স্ক কেউ আশেপাশে নেই। কেউ একজন আশা করতেই পারে যে ইতোমধ্যে কয়েক সপ্তাহ আগে বিশ্ব নেতাদের একটি জরুরি বৈঠকে সাধারণ কর্মপরিকল্পনা করা হয়েছে, কিন্তু তেমনটা হয়নি। জি৭ নেতারা এই সপ্তাহে একটা ভিডিও কনফারেন্স আয়োজন করলে এমন কোনো পরিকল্পনা সেখান থেকেও আসেনি।

২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং ২০১৪ সালের ইবোলা মহামারির মত বৈশ্বিক সঙ্কটগুলোর সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক নেতার ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো, কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন নেতার ভূমিকা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। বর্তমান মার্কিন প্রশাসন খুব স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা মানবতার ভবিষ্যতের চেয়ে শুধুমাত্র আমেরিকার মহানুভবতা নিয়ে অনেক বেশি চিন্তিত। এই প্রশাসন এমনকি তাদের নিকটতম মিত্রদেরও ত্যাগ করেছে। এটি যখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে সমস্ত ভ্রমন নিষিদ্ধ করেছিলো তখন পরামর্শ করা দূরে থাক, এরকম একটা কঠিন পদক্ষেপ সম্পর্কে এমনকি একটা অগ্রিম নোটিশ দেবার প্রয়োজনীয়তাও বোধ করেনি।

নতুন কোভিড-১৯ এর একটি ভ্যাকসিন এর উপর একচেটিয়া স্বত্ত্ব কিনতে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন জার্মানির একটি ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে এক বিলিয়ন ডলার দেবার প্রস্তাব দেওয়ার মধ্য দিয়ে জার্মানিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে। এখন এমনকি বর্তমান মার্কিন প্রশাসন যদি এর অবস্থান বদলে একটি বৈশ্বিক পরিকল্পনা নিয়ে সামনেও এগিয়ে আসে, খুব কম সংখ্যকই এমন এক নেতাকে অনুসরণ করতে চাইবে যে কখনোই দায়িত্ব নেয় না, ভুল স্বীকার করে না, এবং যে সবসময় অন্যদের কাঁধে দোষ চাপিয়ে দেয় আর নিজে সমস্ত কৃতিত্ব গ্রহণ করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা এ শূণ্যতা যদি অন্য দেশগুলো পূরণ করতে না পারে তবে বর্তমান মহামারিটি থামানোই শুধুমাত্র অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে না, বরঞ্চ এর জের সামনের বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তুলবে। তবুও প্রতিটি সঙ্কট একটি সুযোগও বটে। আমাদের অবশ্যই আশা করতে হবে যে বর্তমানের এই মহামারি মানবজাতিকে বৈশ্বিক বিভেদ কর্তৃক সৃষ্ট তীব্র বিপদ সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে।

মানবতার একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া প্রয়োজন। আমরা কি বিভেদের রাস্তায় হাঁটবো নাকি আমরা বৈশ্বিক সংহতির পথ বেছে নেব, আমরা যদি বিভেদকে বেছে নিই তবে এটি কেবল সঙ্কটকালকে আরও দীর্ঘায়িত করবে না বরং ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হবে। আমরা যদি বৈশ্বিক সংহতিকে বেছে নিই, তবে এটি কেবল করোনাভাইরাসের সাথে যুদ্ধে বিজয় হবে না বরং একবিংশ শতাব্দীতে মানবজাতিকে প্রভাবিত করতে পারে এমন সব ভবিষ্যৎ মহামানি ও সঙ্কটের বিপক্ষেও বিজয় হবে।

ফিনান্স্যিয়াল টাইমস থেকে অনুবাদ করা- মূল লেখক: ইয়ুভাল নোয়াহ হারারি, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেম, ইসরায়েল।

প্রতিবেদন শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো খবর
© All rights reserved © 2020 Top News
Theme Developed BY ThemesBazar.Com
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com